© 2024 Curios Bangladesh
উদীয়মান এআই কোম্পানি DeepSeek-এর উত্থান ওয়াল স্ট্রিটে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন প্রশ্ন তুলছেন—এআই উন্নয়নে বিলিয়ন ডলারের ব্যয় কি সত্যিই যৌক্তিক?
এক বছরেরও কম সময় আগে প্রতিষ্ঠিত চীনা এআই কোম্পানি DeepSeek এখন মার্কিন প্রযুক্তি বাজারে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কোম্পানির দাবি, তারা এমন একটি এআই মডেল তৈরি করেছে যা সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমকক্ষ, তবে উন্নয়ন ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
চীনের হাংঝুতে হেজ ফান্ড ম্যানেজার লিয়াং ওয়েনফেং-এর উদ্যোগে DeepSeek প্রতিষ্ঠিত হয়। কোম্পানির দাবি, তাদের R1 মডেল বিশ্বের সেরা এআই সিস্টেমগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম, অথচ এর উন্নয়ন ব্যয় মাত্র ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার—যা অন্যান্য কোম্পানির তুলনায় অত্যন্ত কম।
অন্যদিকে, মাইক্রোসফট, গুগল ও OpenAI-এর মতো মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টরা Large Language Model (LLM) তৈরিতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। প্রতিটি মডেলের উন্নয়নে শত শত মিলিয়ন ডলার এবং পরিকাঠামোতে বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে DeepSeek-এর আবির্ভাব বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতার গতিপথ বদলে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বাইডেন প্রশাসন চীনের এআই সক্ষমতা সীমিত করতে উন্নত মাইক্রোপ্রসেসরের রপ্তানিতে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। তবে DeepSeek-এর সাফল্য এই নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
২০২৫ সালের ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ৫০০ বিলিয়ন ডলারের Stargate উদ্যোগের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের এআই উন্নয়নে বিশাল বিনিয়োগের ইঙ্গিত দেয়।
২০২৫ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে CNBC-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ScaleAI-এর সিইও আলেকজান্ডার ওয়াং বলেন, “আমরা দেখেছি, DeepSeek, যা চীনের অন্যতম একটা এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান, তাদের মডেল বিশ্বমানের শীর্ষ আমেরিকান মডেলগুলোর সমকক্ষ বা আরও উন্নত।”
ডিপসিক এর চমকপ্রদ সাফল্য এনভিডিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ কোম্পানিটি LLM তৈরির জন্য চিপ সরবরাহ করে থাকে। ডিপসিক এর সক্ষমতা ও উন্নয়ন খরচ সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের পর এনভিডিয়ার শেয়ারের মূল্য ৩% হ্রাস পায়। ওয়াংয়ের দাবি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ডিপসিক এনভিডিয়ার ৫০,০০০ এইচ১০০ চিপ সংগ্রহ করেছে। এই দাবি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
DeepSeek এর মোবাইল অ্যাপ, যা তাদের V3 মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি, জানুয়ারিতে অ্যাপলের মার্কিন অ্যাপ স্টোরে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোডকৃত ফ্রি অ্যাপে পরিণত হয়। এর ফলে ডিপসিক এর ওয়েবসাইট এবং API সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
বিশ্বব্যাপী সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা এই সাফল্যের ফলে সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ESET-এর গ্লোবাল সাইবারসিকিউরিটি উপদেষ্টা জেক মুর বলেছেন, “ডিপসিক এর মতো নতুন প্ল্যাটফর্ম, যা দ্রুত মিডিয়ার শিরোনামে আসে, সাধারণত সাইবার অপরাধীদের জন্য আকর্ষণীয় লক্ষ্য হয়ে ওঠে।”
ডিপসিক এর ঘোষিত উন্নয়ন খরচ এবং মার্কিন এআই কোম্পানিগুলোর বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
- R1 মডেলের মোট উন্নয়ন খরচ: ৬ মিলিয়ন ডলার
- DeepSeek-এর সংগ্রহ করা H100 চিপের সংখ্যা: ৫০,০০০
- ওপেন-সোর্স LLM ডেভেলপমেন্ট এর সময়: ২ মাস
২০২১ সালে বাইডেন প্রশাসন উন্নত মাইক্রোপ্রসেসরের রপ্তানি সীমাবদ্ধ করতে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। তবে ডিপসিক জানিয়েছে, তারা Nvidia-এর অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী H800 চিপ ব্যবহার করে তাদের V3 মডেলের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে। কোম্পানিটি Baidu-এর প্রথম চীনা LLM উন্মোচনের পর চীনের এআই বাজারে প্রবেশ করে এবং দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।
ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সংস্থা Andreessen Horowitz-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা মার্ক অ্যান্ড্রেসেন DeepSeek এর পদ্ধতিকে ‘এআই-এর স্পুটনিক মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেছেন।
ডিপসিক এর প্রযুক্তি মূলত ধাপে ধাপে ব্যাখ্যা তৈরি করে, যা উত্তর দেওয়ার আগে যুক্তি প্রদর্শন করে। প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী চামাথ পলিহাপিতিয়া লিখেছেন, “DeepSeek-এর R1 মডেল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ সমাধান করেছে— বড় মাত্রার সুপারভাইসড ডেটাসেট ছাড়াই যুক্তিযুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা।”
তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু সমস্যার সমাধান নয়। মডেলটি স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ লজিকাল চেইন তৈরি করতে শিখেছে, নিজস্ব কাজ যাচাই করতে পারে এবং জটিল সমস্যার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও বেশি কম্পিউটেশনাল শক্তি বরাদ্দ করতে পারে।”
DeepSeek-এর এই সাফল্য বৈশ্বিক এআই প্রতিযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, যেখানে মার্কিন ও চীনা কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে।